মৃত্যুর ১০০ বছর পরেও কমরেড লেনিন বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের মনের মণিকোঠায়- তাঁর কাজ, শিক্ষা এবং তাঁর নেতৃত্বে সম্পন্ন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব যার চিরন্তন তাৎপর্যে আজও জীবিত। বিশ্বের মেহনতি মানুষ শ্রদ্ধাবনত চিত্তে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনে তাঁর অবদানকে স্মরণ করে। মাত্র ৫৪ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনকালে তিনি মানব সভ্যতার বিকাশ ধারায় গুণগত পরিবর্তন সাধনে অনপণেয় ছাপ রেখে গেছেন।
লেনিন: মার্কস-উত্তর মার্কসবাদের রূপকার
মার্কসবাদ কোনও আপ্ত বাক্য নয়– এটি সৃজনশীল প্রায়োগিক বিজ্ঞান। এর মর্মবস্তু কেবল তিনি আত্মস্থ করেননি, এটিকে তিনি নিজে বাস্তবের মাটিতে প্রয়োগ করে রুশ বিপ্লবের বিজয়ের উপযোগী করে তুলেছিলেন। কার্ল মার্কস ‘ফয়েরবাখ বিষয়ে থিসিস’-এ বলেছিলেন, ‘দার্শনিকরা এ যাবৎ পৃথিবীকে কেবল বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, কথা হলো তাকে পরিবর্তন করা।’ লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় বিপ্লব দেখিয়েছিল দুনিয়াকে বদলানো যায়। এটা কোনও অবাস্তব, আকাশকুসুম কল্পনা নয়। এই বিপ্লব দুনিয়াব্যাপী মুক্তিকামী মানুষের লড়াই-আন্দোলনের সাফল্যের সম্ভাবনাকে ও এক শোষণহীন সমাজ তৈরির বাস্তবতাকে সামনে আনে। সমগ্র বিশ্বে এক জোরালো আত্মবিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করে যে, রাশিয়ায় বিপ্লব যদি সফল হতে পারে তবে অন্যান্য দেশেও বিপ্লব সংগঠিত করা সম্ভব এবং জয়যুক্ত হওয়া যেতে পারে। এটাই চিরায়ত প্রাসঙ্গিকতা। মার্কসবাদী তাত্ত্বিক হিসেবে লেনিনের রণনীতি ও রণকৌশল ছিল অনন্য। মার্কসবাদের বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়া, তার সৃজনশীলতা এবং বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণ আত্মস্থ করায় পরিবর্তনশীল বিশ্বে নেতৃত্ব দিতেও তিনি সফল হয়েছিলেন। বিপ্লবী আন্দোলনের বিভিন্ন বাঁক ও মোড়ের মুখে সঠিক কৌশল গ্রহণেও তিনি ছিলেন পটু। এটা ঠিক যে, বিংশ শতাব্দীর বৃহত্তম সামাজিক নির্মাণ প্রকল্পটি ছিল রাশিয়ায় ও পরবর্তীতে চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা এবং ইউরোপের বেশ কিছু ভূখণ্ডে সমাজতন্ত্রের নির্মাণ-যা প্রকৃত অর্থেই মানব উদ্যোগের মহাকাব্যিক উপাখ্যান। এই প্রথম পৃথিবীর মানুষ দেখতে পেলেন যে, এমন সমাজ গঠন করা যায় যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনের মান মুনাফার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। দারিদ্র-নিরক্ষরতা-কর্মহীনতার দূরীকরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসনের ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষার ব্যাপক কাঠামো গড়ে তোলা-প্রভৃতি সাফল্য বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামে অনুপ্রেরণা ও প্রত্যয়ের উৎসে পরিণত হয়।
বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে যে আরো প্রসারিত করে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে উত্তরণ ঘটাতে হবে–সম্পূর্ণ নতুন এই পরিপ্রেক্ষিত উন্মোচনের কাজটিতে লেনিন অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন।
লেনিনবাদ-সাম্রাজ্যবাদী যুগের মার্কসবাদ
পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি ও তা কীভাবে কাজ করে, তার নিয়মসমূহ আবিষ্কার করেন কার্ল মার্কস। মার্কসের মৃত্যুর পরেই পুঁজিবাদ একচেটিয়া পুঁজিবাদের স্তরে প্রবেশ করেছিল। মার্কসীয় শিক্ষা সম্পর্কে লেনিনের অসাধারণ ব্যুৎপত্তির কারণে, তিনি মার্কসের পুঁজির পর্যবেক্ষণ ও প্রবণতার দিক উল্লেখ করে বলেছিলেন পুঁজিবাদ বিকশিত হওয়ার সাথে সাথে পুঁজির কেন্দ্রীভবন ও সঞ্চয়ের প্রবণতা এক নতুন স্তরে পৌঁছে গুণগত পরিবর্তন ঘটানোর দিকে এগুচ্ছে । লেনিন দেখালেন একচেটিয়া পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত তাগিদের কারণে পুঁজির শাসন সাম্রাজ্যবাদের পর্যায়ে এসে দুনিয়াজোড়া ব্যবস্থা হিসাবে সামগ্রিক দাসত্বের স্তরে আমাদের ঠেলে দিয়েছে। এই স্তরকে তিনি সাম্রাজ্যবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় হিসাবে অভিহিত করেন। প্রথাগত মার্কসীয় ধারণা ছিল, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্ভব একমাত্র সেই সব সমাজে যেখানে পুঁজিবাদের পরিপূর্ণভাবে বিকাশ ঘটেছে। লেনিন এই চালু আশাবাদের ছক ভেঙ্গে দিলেন। তিনি দেখালেন সাম্রাজ্যবাদ সমগ্র বিশ্বকে পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় শৃঙ্খলিত করে ফেলেছে ঠিকই, তবে সাম্রাজ্যবাদের অন্তর্দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে তার শিকলের দুর্বলতম গ্রন্থটি ভেঙে ফেলা সম্ভব। ১৯১৭ সালে একটি অনুন্নত বা পশ্চাৎপদ দেশ রাশিয়ার সফল বিপ্লব সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে গ্রামশি বলেছিলেন, এটা আসলে মার্কসের ‘ক্যাপিটাল’-এর বিরুদ্ধে সংগঠিত বিপ্লব। আসলে তিনি যা বলতে চেয়েছিলেন তা হলো– উন্নত দেশে পুঁজিবাদী বিকাশের মধ্যে দিয়ে উদ্ভূত সংকট পরিপক্ক হলে বিপ্লবের অবস্থা তৈরি হবে-এরকমই সম্ভাবনার ইঙ্গিত ছিল মার্কসের পুঁজির বিশ্লেষণে। আবার রাশিয়ার এই বিপ্লব পুঁজি ও শ্রমিক শ্রেণির সরাসরি সংঘাত মধ্য দিয়ে শুধুমাত্র উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের সংঘাত হিসাবে প্রতিফলিত হয়েছিল এ কথা বললেও ভুল হবে। ফরাসি মার্কসবাদী দার্শনিক আলথুজার এ সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন যে, এই সন্ধিক্ষণ ছিল অজস্র ঘাত-প্রতিঘাতের সংশ্লেষ এবং সংঘাতগুলির পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও বিন্যাসকে না ধরে শুধুমাত্র একমাত্রিক দ্বন্দ্বের নিরিখে বিপ্লবের প্রবাহকে বোঝার চেষ্টা করলে ভুল হবে। এটা তো ঠিক যে, একটি পশ্চাৎপদ দেশে উন্নত সমাজ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম যে অজস্র সংঘাতের জন্ম দেবে তা কাঙ্খিত। কিন্তু সমগ্র বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছিল ইউরোপের উঠোন থেকে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পেরেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। লেনিনের অবদানের জন্যই ১৯২৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর, তৃতীয় আন্তর্জাতিকের পঞ্চম কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুসারে বৈজ্ঞানিক সমাজবাদের মতবাদকে মার্কসবাদ- লেনিনবাদ হিসেবে চিহ্নিত করা হল। স্তালিন বললেন, লেনিনবাদ– সাম্রাজ্যবাদী যুগের মার্কসবাদ। দুনিয়ার দেশে দেশে শ্রমজীবী মানুষকে সোভিয়েত ব্যবস্থা এতটাই আকর্ষণ করতে পেরেছিল যে কমিউনিজমের ভূতে ভীত হয়ে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রও জনকল্যাণমূলক ধারণা কার্যকরী করতে বাধ্য হয়েছিল মেহনতি মানুষের সংগ্রামের পরিণতিতে।
حتى بعد مرور مئة عام على وفاته، لا يزال الرفيق لينين يحتل مكانة رفيعة في قلوب الطبقة العاملة في العالم — بفضل أعماله، وتعاليمه، والثورة الاشتراكية التي أنجزها تحت قيادته والتي لا تزال حية بمعناها الخالد. يستذكر العمال والكادحون في كل مكان بإجلالٍ إسهامَه في بناء مجتمع خالٍ من الاستغلال. فعلى الرغم من أن حياته كانت قصيرة لم تتجاوز 54 عامًا، فقد ترك بصمة لا تُمحى في مسار تطور الحضارة الإنسانية.
لينين: مُجدِّد الماركسية بعد ماركس
لم تكن الماركسية بالنسبة إلى لينين مجرد مقولات جاهزة، بل علمٌ إبداعيٌّ تطبيقيٌّ. لم يكتفِ باستيعاب جوهرها، بل طوّرها وطبقها على أرض الواقع، فحوّلها إلى أداةٍ عملية لانتصار الثورة الروسية. كان كارل ماركس قد قال في أطروحاته حول فيورباخ: «لقد فسر الفلاسفة العالم بطرق مختلفة، والمهم هو تغييره.» وقد أثبتت الثورة الروسية بقيادة لينين أن تغيير العالم أمر ممكن وليس حلمًا خياليًا. لقد فتحت هذه الثورة أمام البشرية أفقًا جديدًا للنضال من أجل التحرر، وأظهرت أن بناء مجتمع بلا استغلال هدف واقعي يمكن تحقيقه. وأكدت بثقةٍ لا مثيل لها أن نجاح الثورة في روسيا يعني أن الثورات يمكن أن تنتصر في بلدان أخرى أيضًا — وهذه هي راهنية اللينينية الدائمة.
كمنظّر ماركسي، كان لينين متميزًا في استراتيجيته وتكتيكاته. فقد استوعب المنهج العلمي للماركسية، وإبداعها، ورؤيتها الشاملة للعالم، مما مكنه من قيادة نضالٍ ثوري في عالمٍ متغير. وكان بارعًا في اختيار التكتيك الصحيح في كل منعطف من منعطفات الحركة الثورية. لا شك أن أعظم مشروعٍ اجتماعي في القرن العشرين كان بناء الاشتراكية في روسيا، ثم في الصين، وفيتنام، وكوبا، وعدة مناطق أوروبية — وهي ملحمة بطولية في تاريخ المبادرة الإنسانية. لأول مرة، رأت البشرية إمكانية قيام مجتمع تُمنَح فيه قيمة حياة الإنسان العادي أهميةً أكبر من الربح. وشكل القضاء على الفقر والأمية والبطالة، وإرساء نظامٍ واسعٍ للحماية الاجتماعية في مجالات التعليم والصحة والسكن، مصدر إلهام وثقة لنضالات العمال في العالم بأسره.
لقد كان لينين صاحب الدور الريادي في تطوير الفكرة الجديدة القائلة بأن الثورة البرجوازية الديمقراطية يجب أن تتوسع وتنتقل، تحت قيادة الطبقة العاملة، إلى مرحلة الثورة الاشتراكية.
اللينينية: الماركسية في عصر الإمبريالية
لقد اكتشف كارل ماركس قوانين حركة النظام الرأسمالي وكيفية عمله. لكن بعد وفاة ماركس، دخلت الرأسمالية مرحلة الاحتكار. وبفضل الفهم العميق الذي امتلكه لينين لتعاليم ماركس، أوضح أن تطور الرأسمالية يؤدي إلى تركّز رأس المال وتراكمه على نحوٍ يفضي إلى تحولٍ نوعيٍّ جديد. وبيّن أن اندفاع الرأسمالية نحو الاحتكار قد أوصلها إلى مرحلة الإمبريالية، أي إلى نظامٍ عالمي من العبودية الشاملة. وقد وصف لينين هذه المرحلة بأنها «أعلى مراحل الرأسمالية».
كانت الفكرة الماركسية التقليدية تقول إن الثورة الاشتراكية لا يمكن أن تتحقق إلا في المجتمعات التي بلغت الرأسمالية فيها أقصى درجات تطورها. غير أن لينين كسر هذا التصور المألوف، وأثبت أن الإمبريالية، رغم ربطها العالم كله بنظامٍ رأسمالي موحد، تحتوي على تناقضاتٍ داخلية يمكن استغلالها لكسر أضعف حلقاتها.
وقد وصف غرامشي ثورة 1917 في روسيا، وهي ثورة في بلدٍ متخلف، بأنها "ثورة ضد كتاب رأس المال"، أي ضد القراءة الجامدة لماركس. فماركس أشار إلى أن نضوج أزمة الرأسمالية في البلدان المتقدمة يمكن أن يخلق شروط الثورة، لكن الثورة الروسية بيّنت أن الصراع لا يقتصر على المواجهة بين العمل ورأس المال فحسب، بل يتشابك مع عوامل اقتصادية وسياسية وثقافية متعددة. وكما أشار الفيلسوف الفرنسي الماركسي ألتوسير، فإن فهم الثورة من منظورٍ أحادي البعد يغفل تفاعل التناقضات المتعددة التي شكّلتها.
ومن الطبيعي أن يؤدي السعي لبناء علاقات اجتماعية متقدمة في بلدٍ متخلف إلى صراعاتٍ عديدة. ومع ذلك، فقد شهد العالم كيف تحولت روسيا السوفيتية، في بضعة عقود، من بلدٍ زراعي متأخر إلى ثاني أقوى قوةٍ اقتصادية في العالم. وبفضل إسهام لينين، قرر المؤتمر الخامس للأممية الثالثة سنة 1924 أن يُعرَف الاشتراكية العلمية باسم الماركسية-اللينينية. وقد قال ستالين إن اللينينية هي الماركسية في عصر الإمبريالية.
لقد كانت جاذبية النظام السوفييتي عظيمة إلى درجة أن الطبقات العاملة في أنحاء العالم تأثرت به، واضطرّت الدول الرأسمالية، خوفًا من «شبح الشيوعية»، إلى تطبيق سياساتٍ اجتماعية لصالح الشعوب تحت ضغط نضالاتها.
ليست هناك تعليقات:
إرسال تعليق